আজ, সোমবার | ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | রাত ৪:৪৬

ব্রেকিং নিউজ :
স্বাধীনতার মার্চ: অপারেশন সার্চলাইট থেকে বিজয়ের লাল-সবুজ পতাকা জনগণের কথা জানতে মাগুরায় ৯টি অভিযোগ বাক্স স্থাপন মাগুরায় শোভাযাত্রায় নিতাই রায় চৌধুরী ও মনোয়ার হোসেন খানের অভ্যর্থনা মাগুরায় ভিজিএফ কার্ড বণ্টন নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনায় বিএনপির ১৪ জন গ্রেফতার মাগুরা পৌরসভার সাবেক প্রশাসকের বিরুদ্ধে আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ আইজিপি হলেন মাগুরার সাবেক পুলিশ সুপার ভাষার জন্য ভালোবাসা মাগুরায় ভাষাসৈনিক হামিদুজ্জামান এহিয়া’র নামে সড়ক শালিখায় দুই কীটনাশক ব্যবসায়ীকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেলেন মাগুরার এমপি নিতাই রায় চৌধুরী

স্বাধীনতার মার্চ: অপারেশন সার্চলাইট থেকে বিজয়ের লাল-সবুজ পতাকা

মাগুরা প্রতিদিন : শুরু হলো স্বাধীনতার মাস মার্চ—১৯৭১ সালের সেই উত্তাল সময়, যা বদলে দিয়েছিল এই উপমহাদেশের ইতিহাস। এই মাসেই নতুন মোড় নেয় রাজনীতি, স্পষ্ট হয়ে ওঠে বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণের অদম্য দাবি। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়। একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয় নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ—যা বিজয় দিবস হিসেবে জাতি স্মরণ করে গভীর শ্রদ্ধায়।

১৯৭১ সালের ১ মার্চ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পরও বাঙালি জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করেন তৎকালিন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। এতে ভেঙে পড়ে রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা। ক্ষোভে ফেটে পড়ে পূর্ববাংলা। শুরু হয় হরতাল, অসহযোগ ও সর্বাত্মক আন্দোলন।

২ মার্চ ঢাকায় হরতাল পালিত হয়। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)–এর নেতারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবেশ করে দেশের মানচিত্রখচিত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পতাকা উত্তোলন করেন।

৩ মার্চ সারা দেশে হরতাল পালিত হয় এবং গঠিত হয় ‘ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’। আন্দোলন ক্রমেই সর্বাত্মক রূপ নেয় এবং তা অব্যাহত থাকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত।

৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ঐতিহাসিক ভাষণ দেন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ঘোষণা করেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম,” এবং ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। এই ভাষণ বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামকে চূড়ান্ত প্রস্তুতির পথে নিয়ে যায়।

পরিকল্পিত দমন-পীড়নের অংশ হিসেবে ২৫ মার্চ ১৯৭১ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী শুরু করে ‘অপারেশন সার্চলাইট’। এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত গণহত্যা অভিযান, যার উদ্দেশ্য ছিল মার্চ মাসজুড়ে গড়ে ওঠা বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে রক্তাক্তভাবে দমন করা। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের নির্দেশে পরিচালিত এই অভিযান ছিল ১৯৭০ সালের নভেম্বরে প্রণীত ‘অপারেশন ব্লিটজ’-এর ধারাবাহিকতা। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৬ মার্চের মধ্যে দেশের বড় বড় শহর দখল এবং এক মাসের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইপিআর সদরদপ্তর, পুলিশ লাইনসহ বিভিন্ন স্থানে নির্বিচার হামলা চালানো হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে পাকবাহিনীর পাশাপাশি তাদের দোসর আলবদর, আল শামস ও রাজাকার বাহিনী নিরীহ মানুষ ও স্বাধীনতাকামী মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর চালায় নির্মম নির্যাতন ও নিধনযজ্ঞ। গ্রাম থেকে শহর—দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে হত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও ধর্ষণের বিভীষিকা। বুদ্ধিজীবী হত্যার মাধ্যমে জাতিকে মেধাশূন্য করার অপচেষ্টাও চালানো হয়। ইতিহাসের এই অধ্যায় কেবল গণহত্যার দলিল নয়; এটি এক জাতির অসীম আত্মত্যাগ ও প্রতিরোধের প্রতীক।

২৫ মার্চ দিবাগত প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। গ্রেপ্তার হওয়ার আগে তিনি দেশবাসীকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান। পরে তাঁর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন মেজর জিয়াউর রহমান। চট্টগ্রাম থেকে সম্প্রচার শুরু করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, যা মুক্তিযুদ্ধের সময় সাহস ও প্রেরণার বাতিঘর হয়ে ওঠে। ১০ এপ্রিল গঠিত হয় মুজিবনগর সরকার; স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পায় এবং সংগঠিত রূপ পায় মুক্তিযুদ্ধ।

নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় চূড়ান্ত বিজয়। কিন্তু এর বিনিময়ে জাতিকে দিতে হয়েছে প্রায় ৩০ লাখ শহীদের প্রাণ এবং দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম। অসংখ্য পরিবার হারিয়েছে প্রিয়জন, অসংখ্য জনপদ পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের দিয়েছে একটি স্বাধীন ভূখণ্ড, লাল-সবুজের পতাকা এবং আত্মমর্যাদার পরিচয়। তবে স্বাধীনতার চেতনাকে ধারণ করে সামনের পথ চলাই এখন বড় দায়িত্ব। কারণ স্বাধীনতা কেবল অর্জনের বিষয় নয়—এটি রক্ষা করারও অবিরাম সংগ্রাম।

শেয়ার করুন...




©All rights reserved Magura Protidin. 2018-2022
IT & Technical Support : BS Technology